সাইফুল ইসলাম, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: জন্মের মাত্র দুই বছর বয়সে মারা যান শিমা আক্তারের দিনমজুর বাবা। মায়ের কাছেই বড় হচ্ছেন শিমা আক্তার। বাবার জমিজমা না থাকায় অর্থাভাব তার পিছু ছাড়েনি। বাবার মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়ে শিমা আক্তারকে মানুষ করার যুদ্ধে নামেন তার মা। তাকে কাজ করতে হয়েছে অন্যের বাসায়। সেই শিমার অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে উপজেলার ইউসুফদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালের অনুষ্ঠিত এসএসসিতে পরিক্ষায় ব্যবসায়ের শিক্ষা শাখা থেকে জিপিএ-৪.০৬ পেয়েছে সে। চরম দারিদ্র্য তাকে হার মানাতে পারেনি। মেধাবী শিক্ষার্থী শিমা আক্তার ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাঙ্গারদিয়া গ্রামের দিনমজুর মৃত সাখো খানের একমাত্র মেয়ে।

সেই শিমা আক্তার ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে সালথা সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছে। এতে শিমার মা খুশিতে আত্মহারা হলেও পড়ালেখার খরচ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। বিষয়টি জানতে পেরে শিমার পঁাশে এসে দঁাড়িয়েছে সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া স্কুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনিকটি শিমার পড়ালেখার সমস্ত খরচ চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সাখো খান অনেক দরিদ্র ছিলেন। অল্প কিছু জমির ওপর ছোট একটি টিনের ঘর ছাড়া কোনো সম্পত্তি ছিল না তার। তিনি অন্যের জমিতে দিমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শিমার জন্মের মাত্র দুই বছর পর সাখো খান মারা যান। এরপর তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম মাত্র দুই বছর বয়সী মেয়ে শিমাকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। একপর্যায় স্বামীর বাড়ি ছেড়ে পাশ্ববর্তী ইউসুফদিয়া গ্রামে তার বাবার বাড়িতে চলে যান। সেখানে থেকেই মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মেধাবী শিক্ষার্থী শিমা আক্তার জানায়, জন্মের পর থেকেই কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার পিতা মারা যান। তাই মামাদের বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করতে হয়েছে। আমার লেখাপড়ার খরচ বহন করার দায়িত্ব নিয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইউসুফদিয়া স্কুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। আমি ফাউন্ডেশনের প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ। আমি মনে করি, ফাউন্ডেশনের এ সহযোগিতা বিফলে যাবেনা। তাদের সহযোগিতায় আমি সাফল্য অর্জন করতে পারবো। পড়ালেখা করে আমি মানুষের মত মানুষ হতে চাই।
শিমার মা নুরজাহান বলেন, অনেক কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া শেখাতে হচ্ছে। আমার স্বামীর কোনো জমিজমা ছিল না। তিনি মারা যাওয়ার পর আমাদেরকে বিভিন্ন সময় খেয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। জীবনের তাগিদে শিমাকে আমার মায়ের কাছে রেখে আমি একটি বাসায় বুয়ার কাজ শুরু করি। বুয়ার কাজ করে যা উপার্জন হতো, তা দিয়ে শিমার ভরণ-পোষণ ও পড়ালেখার খরচ চালাতাম। আমি শুধুমাত্র মেয়ের কথা চিন্তা করে আর বিয়েও করেনি। মেয়েই আমার কাছে সবকিছু মনে হয়েছে। শিমা এবার সালথা সরকারি কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় অনেক খুশি হয়েছি। এখন মনে হচ্ছে আমার কষ্টের সুফল পাচ্ছি।
তিনি আরো বলেন, শিমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারব কিনা চিন্তায় ছিলাম। তবে সে চিন্তাও দুর হয়েছে। শিমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পড়ালেখার সকল খরচের দায়িত্ব নিয়েছে ইউসুফদিয়া স্কুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ইতোমধ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে শিমার নতুন কলেজে ভর্তির যাবতীয় খরচ দিয়েছে। আমি মন থেকে সংগঠনটির জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন সমাজের জন্য সংগঠনটিকে আরও কাজ করার তাওফিক দেয়।
ইউসুফদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম বলেন, আমাদের স্কুলের সাবেক ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ইউসুফদিয়া স্কুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। তারা সব সময় স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতনতা মূলক সেমিনার, অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের খোজ খবর নিচ্ছে এবং এলাকায় সামাজিক কাজ করে যাচ্ছে। শিমা আক্তারের কলেজে লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ায় এই সংগঠনের সবাইকে ধন্যবাদ।
ইউসুফদিয়া স্কুল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: তাজুল ইসলাম বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে শিমাকে লেখাপড়া করার জন্য যাবতীয় সহযোগিতা করা হবে। সংগঠনের সদস্যদের আন্তরিকতা, পরামর্শ এবং প্রবাসী সদস্যদের সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে যাচ্ছি। অন্যদিকে শিমার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গরিব মেধাবি শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমরা চাই সমাজে কারো যেন দারিদ্রতার কারনে লেখা পড়া বন্ধ না হয়।
projonmo21.com Popular bangla online newsportal