সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের সালথা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি এনায়েত হোসেন চান মিয়া। অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাদাবাজীর অনেক অভিাযোগ তার বিরুদ্ধে। এমনকি তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদটিও জাল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও চাঁদাবাজি করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। এছাড়া ফরিদপুর শহরে ১৫ শতাংশ ও নিজ গ্রামে কয়েক একর ফসলি জমি কিনেছেন চান মিয়া।
সালথা উপজেলার জয়ঝাপ উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করা চানমিয়া অন্য একজনের দাখিল পাসের সার্টিফিকেট এডিট করে নিজের নামে সনদ ইসু করে দলিল লেখকের লাইসেন্স করেছেন। এবিষয়ে বাংলাদেশ দলিল লেখক নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক বরাবর একটি অভিযোগ দিয়েছে স্থানীয় ৪ ব্যক্তি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সালথা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাধারন সম্পাদক শিবু নাগ জানান, তাদের সমিতির মেয়াদ তিন বছর। ২০২১ সালের জানুয়ারীতে নির্বাচন করে বর্তমান কমিটি হয়েছে।
খেঁাজ নিয়ে জানা যায়, এনায়েত হোসেন চান মিয়া সালথা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা। দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে গেলে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সমিতির নামে একটি নির্ধারিত হারে চঁাদা আদায় করছেন তিনি। ভূমি রেজিস্ট্রেশনের যাবতীয় খরচের টাকা আদায় করছেন তিনি। সাধারণ দলিল লেখকরাও জিম্মি হয়ে পড়েছেন চঁান মিয়ার কাছে। তারা চান মিয়ার বাইরে গিয়ে কোনো ভূমি রেজিস্ট্রেশন করতে পারছেন না। রেজিস্ট্রি অফিসকে জিম্মি করে সরকারি নির্ধারিত ফির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন তিনি। সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে চাঁদা আদায় করে তিনি হয়েছেন কোটিপতি।
স্থানীয় শাহজাহান মিয়া নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, চান মিয়া অবৈধভাবে টাকা ইনকাম করে ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলার বিল মামুদপুর মৌজায় ১৫ শতাংশ জায়গা কিনেছেন, যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। গত ইউপি নির্বাচনে স্থানীয় গট্টি ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী খন্দকার রেজাউর রহমান চয়নের কাছ থেকে দুই একর জমি কিনেছেন, যার বাজার মূল্য আনুমানিক ৫০ লক্ষ টাকা। এছাড়া এলাকায় আরো অন্যান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকেও প্রায় দুই কোটি টাকার জমি কিনেছেন তিনি।
স্থানীয় আডুয়াকান্দি গ্রামের আশিকুর রহমান রোমান বলেন, এনায়েত হোসেন চান মিয়া অন্য একজনের সার্টিফিকেট কম্পিউটারের মাধ্যমে এডিট করে তার নিজের নাম দিয়ে দলিল লেখক হিসেবে লাইসেন্স করেছেন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সালথা উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হয়েছেন। এছাড়া এলাকায় কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবককে টাকা পয়সা দিয়ে হাতে রেখেছেন এনায়েত হোসেন চান মিয়া। তার অবৈধ কার্যকলাপে কেউ বাধা দিতে গেলে তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়।
গত ১ জানুয়ারী চান মিয়ার বিরুদ্ধে দলিল লেখক নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শকের দফতরে একটি লিখিত অভিযোগ করেন স্থানীয় ওলিদ ফকির, সুজন মাতুব্বর, ফরহাদ শিকদার ও মঙ্গল শেখ নামে চার ব্যক্তি। তারা অভিযোগে বলেন, চান মিয়া ২০০৭ সালে নগরকান্দা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল লেখকের লাইসেন্স করেন। লাইসেন্স নম্বর- ১৪/২০০৭। তবে তিনি জয়ঝাপ উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে অষ্টম শ্রেণী পাস করলেও মাদরাসা বোর্ড থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জাল সনদ জমা দিয়ে দলিল লেখকের লাইসেন্স নিয়েছেন। বর্তমানে নগরকান্দা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তিনি সালথা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল লেখকের কাজ করছেন।
ফরহাদ শিকদার নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, আমি এনায়েত হোসেন চান মিয়ার বিরুদ্ধে দলিল লেখক নিবন্ধন অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার কারণে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ও তার গুন্ডা বাহিনী দিয়ে আমার উপরে হামলা করলে আমি দৌড়ে পালিয়ে নিজের জীবন বাঁচাই। আমি এখন তার গুন্ডা বাহিনীর ভয়ে আতঙ্কে আছি, তারা যে কোন সময় আমার বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে এই মর্মে আমি সালথা থানায় সাধারন ডায়রীও করেছি।
মাদ্রাসা বোর্ডে খেঁাজ নিয়ে জানা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখক হিসাবে নিবন্ধনের জন্য এনায়েত হোসেন চান মিয়া যে সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন এই নামে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে কোন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি।
এদিকে এনায়েত হোসেন চান মিয়ার বিরুদ্ধে দলিল লেখক নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক বরাবর যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সেটার ব্যপারে তদন্ত শুরু করেছে কতৃপক্ষ। অভিযোগটি সরেজমিন তদন্তের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে চরভদ্রাসন উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার ফয়সাল হোসেনকে। ইতোমধ্যে ফয়সাল হোসেন সালথা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, ঘটনার আলোকে আমি তদন্ত শুরু করেছি। শুনানীর দিনে এনায়েত হোসেন তার মূল সনদ দেখাতে পারেননি। তিনি একটি ফটোকপি দেখিয়েছেন। ঘটনাটি সঠিক ভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য মাদ্রাসা বোর্ডে খেঁাজ নিতে হবে। একারনে তদন্ত সম্পূর্ণ করতে একটু সময় লাগবে।
এনায়েত হোসেন চান মিয়া তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রেজিস্ট্রি অফিসে অনেক টাকা ইনকাম হয় এ কারণে একটি মহল আমার কাছে কয়েক বার চঁাদা দাবি করে। আমি চঁাদা দিতে অস্বীকার করলে, তারা আমার উপরে ক্ষিপ্ত হয়ে দলিল নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহা-পরিদর্শক বরাবর আমার বিরুদ্ধে মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
projonmo21.com Popular bangla online newsportal