জসীমউদ্দিন ইতি ঠাকুরগাঁও:
প্রশাসনিক কাঠামোর স্বাভাবিক নিয়মে কর্মকর্তাদের পদায়ন, বদলি কিংবা পদোন্নতি অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাত্যহিক একটি প্রক্রিয়া। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও প্রশাসনিক রদবদল ঘটছে। তবে কিছু কিছু ঘটনা প্রশাসনিক ব্যবস্থার ধরাবাঁধা নিয়মকে অতিক্রম করে রূপ নেয় গভীর মানবিক প্রেরণা, অধ্যবসায় এবং এক অবিশ্বাস্য জয়গাথায়। ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তঘেঁষা রাণীশংকৈল উপজেলায় বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদারের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে যোগদান তেমনই এক ঐতিহাসিক ও বিরল নজির স্থাপন করেছে।
নিয়তির কী অদ্ভুত ও সুন্দর সমীকরণ! আজ থেকে কয়েক বছর আগে, ২০১৭ সালের শেষভাগে যিনি এই রাণীশংকৈলের মাটি ও মানুষের মাঝে এসেছিলেন একজন সাধারণ সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে, আজ কঠোর সাধনা ও মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি সেই উপজেলারই সর্বেসর্বা—শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ২০১৭ সালে কাদিরহাট ক্লাস্টারের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ঝরে পড়া রোধে ধূলিমলিন মাঠে যে তরুণ কর্মকর্তা দিনরাত পরিশ্রম করেছিলেন, আট বছর পর একই উপজেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আসনে তাঁর ফিরে আসা কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশ মাঠপ্রশাসনের ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
গোলাম রব্বানী সরদারের এই পথচলা কোনো মসৃণ রাজপথ ছিল না। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতার সম্মানজনক পেশা ছেড়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ের ব্যস্ত দাপ্তরিক দায়িত্ব সামলে বিসিএস ক্যাডারের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন—এসবই তাঁর প্রখর মানসিক জোর ও লক্ষ্যনিষ্ঠার প্রমাণ দেয়। একজন সাধারণ চাকরিজীবী হয়েও নিজের স্বপ্নকে বড় রাখার যে সাহসিকতা তিনি দেখিয়েছেন, তা বর্তমান তরুণ সমাজ ও আমলাতন্ত্রের জন্য এক মহতী বার্তা বহন করে।
প্রশাসনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন নতুন ইউএনও পদায়নের পর এলাকা, স্থানীয় রাজনীতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা অনুধাবন করতেই বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে যায়। কিন্তু গোলাম রব্বানী সরদারের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাণীশংকৈলের তৃণমূলের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রান্তিক মানুষের জীবনের কষ্ট, ভৌগোলিক সীমানা এবং এখানকার স্থানীয় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জসমূহ তাঁর নখদর্পণে। যে কর্মকর্তা একদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে গিয়ে শিশুদের শিক্ষার খোঁজ নিয়েছেন, তিনি আজ পুরো উপজেলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও আইন-শৃঙ্খলার অভিভাবক। এই পূর্ব অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে তাঁকে একজন প্রথাগত আমলার বদলে অত্যন্ত কার্যকর ও ‘জনবান্ধব নির্বাহী কর্মকর্তা’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করবে।
আমাদের সমাজে যখন সংবাদের বড় একটি অংশজুড়ে থাকে হতাশা, দুর্নীতির খবর কিংবা তরুণদের দিকভ্রান্তির গল্প; ঠিক তখন গোলাম রব্বানী সরদারের এই দৃষ্টান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অধ্যবসায়, মেধা এবং সততা কখনো ব্যর্থ হয় না। সুযোগ ও সুবিধার অভাব কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ কখনোই মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। নিজের লক্ষ্য স্থির রেখে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেলে যেকোনো সাধারণ অবস্থান থেকেও সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করা সম্ভব।
মাঠপ্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের যথাযথ বাস্তবায়নে নতুন ইউএনও তাঁর এই আবেগ ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটাবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। গোলাম রব্বানী সরদারের এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন রাণীশংকৈল উপজেলার সার্বিক প্রশাসনিক গতিশীলতাকে নতুন মাত্রা দিক এবং তাঁর এই জীবনের গল্প দেশের হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের পথচলার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠুক। নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আগামী দিনগুলোর সফল কার্যকালের জন্য রইল নিরন্তর শুভকামনা।
projonmo21.com Popular bangla online newsportal