দেলোয়ার হোসেন সিকদার।
কালিয়াকৈর ( গাজীপুর) থেকে। “আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুল পুরে যাও,
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটু খানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি”।
পল্লী কবি জসীমউদ্দিনের কালজয়ী অমর সৃষ্টি কুলের মধ্যে “আসমানী” নামক কবিতা টি তাকে অনন্য উচ্চতায় স্হান করে দিয়েছে।স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষ তখন ছিল খুবই কষ্টে।
অর্ধাহারে অনাহারে আসমানী ছিল খুবই রোগাক্রান্ত। অর্ধাহারে অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় আসমানীরা দিনাতিপাত করতো। সেই করুণ ও নির্মম পরিস্থিতির এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছিল পল্লী কবি, মানবতার কবি জসীমউদ্দিনের এ অমর রচনায়।স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেক আসমানীরা অবহেলায় অযত্নে পড়ে থাকে রাস্তায়।

দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, উন্নয়নশীল ও ডিজিটাল থেকে এখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে হাটছে, এখনো রাস্তার ধারে, ফুটপাতে অসংখ্য আসমানীদের দেখতে পাওয়া যায়। যাদের দিন কাটে অনাহারে অর্ধাহারে। এমনি এক আসমানীর দেখা পাওয়া গেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কালিয়াকৈর পুরাতন বাস স্টেশনের তিনশ গজ পশ্চিমে। ছোট্ট একটি খুপরি, খুপরিও নয় ছেঁড়া নোংরা ময়লা যুক্ত পলিথিন পেচিয়ে তিন ফুট উচ্চতার পাঁচ ফুট লম্বা একটি খোয়াড়। সেই খোঁয়াড়ে মনোয়ারা থাকে তার একমাত্র ছেলে মনোয়ার কে নিয়ে। র্অধাহারে অনাহারে ও অপুষ্টিতে ভোগে জসীমউদ্দিনের আসমানীর মতোই হাড় কংকাল হয়ে গেছে ।যার কথা বলছি সে হলো স্বামী হারা মনোয়ারা বেগম।
আজ হতে প্রায় বিশ বছর পূর্বে স্বামী সোবহান এবং পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মনির মিয়াকে নিয়ে জীবিকার উদ্দেশ্য কালিয়াকৈরে আসেন হত ভাগী মনোয়ারা। স্বামী সোবহান দিনমজুর আর মনোয়ারা রাইসমিলে কুড়া,,চাল ঝারার কাজ করতো। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখেই চলছিল তাদের ছোট্ট সংসার। ছয় বছর আগে স্বামী সোবহান হঠাৎ মারা গেলে হত ভাগী মনোয়ারা সংসারের হাল কাঁধে তুলে নেন। ছেলে মনোয়ার রাজমিস্ত্রীর সহযোগী। একদিন কাজ থাকলে দু দিন কাজ থাকেনা। তাই অনাহারে অর্ধাহারে দিন -রাত কাটে মনোয়ারার।
দুই বৎসর আগে অজানা রোগে হঠাৎ কোমড় হতে হাটু অবধি প্যারালাইস হয়ে গেলে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনি, ফলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।আর জায়গা হয় সড়কের পাশের ময়লার ভাগাড়ে।শুক্রবার হাটের দিন সেখানে বসে মাছ ও মাংসের বাজার। গরু জবাই ও মাছের উচ্ছিষ্ট সেই সাথে আশেপাশের ময়লা আবর্জনার পচা দূর্গন্ধে দু- চার মিনিট দাড়িয়ে থাকায় দায়, সেখানেই মাসের পর মাস চলছে পঙ্গু অসহায় বৃদ্ধা মনোয়ারার।যে একটু দূর থেকে বোঝার উপায় নেই ওই ছোট্ট খুব রীতি কোন মানুষ বসবাস করে। প্রতিবেদক একটু আগ্রহ নিয়ে খুপড়ির কাছে গেলেই খুপরি এর ভিতর হতে হামাগুড়ি দিয়ে খুপরি হতে বের হতে চেষ্টা করলেন। প্রতিবেদক তাকে জিগ্যেস করতেই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তার নিদারুণ নিষ্ঠুর কষ্টের কথা শুনালেন।ছেলে মনোয়ার কোথায়? জানতে চাইলে মনোয়ারা বললেন – আর বাবা পুলার কতা কি আর কমু, পুলায় আমার রাজমিস্ত্রীর জুগিলা, একদিন কাম করলে দুই দিন কাম পায়না। বুদ্ধি ও ইটু কম, তাই কামে ঠিক মতে মাইনসে নেয়না।তাই কোন সম খাই নয়লে না খাইয়াই থাকি।
যখন কথা হয় তখন প্রায় বেলা দুপুর, খুপরির কাছে বসতেই দেখা গেল মনোয়ারার চারপাশে মাছি মশা ভন ভন করছে।
সেই সাথে গরু, মুরগী ও মাছের উচ্ছিষ্টের উদ্ভট ও উৎকট গন্ধে বসে থাকা দায়। পথচারীরা নাকেমুখে কাপড় দিয়ে চলাচল করছে, তারই মাঝে মনোয়ারা পলিথিন পেচানো ছোট্ট খুপরি বানিয়ে বসবাস করছে। কথা বলছেন আর ছোট্ট একটি বটি দিয়ে আলো ও মরিচ কাটছিলেন। দুপুরে রান্না হবে। কিন্তু কি দিয়ে কি রান্না করবে তাও জানেন না মনোয়ারা।কখন ছেলে আসবে, কিছু হয়তো নিয়ে আসলে রান্না হবে নতুবা নাই। অজানা কষ্টে ও দুশ্চিন্তায় পাড় হয়ে যায় সময়।
ঐ ছোট্ট খুপরিতে গাদাগাদি করে মা ও ছেলে ঘুমায়।
রশি দিয়ে বাঁধা দুটো মুরগী – জিগ্যেস করলাম এগুলো কার? বললেন, মুরগী দুইডা পালবানছি বর কয়দিন গেলে বেছুম, বেইচা পড়নের কাপড় কিনুম”
শরীর দিয়ে গন্ধ বের হচ্ছে ছেঁড়া ময়লা একখানা কাপড় জরিয়ে আছে গায়।গা গোসল হয়না কত দিন? জবাবে বললেন – আর বাবা কেমনে নাহামু পুলাডায় দশদিন পনের দিন বাদে বাদে পানি আইনা দেয় তাই ইট্টু কোন রহমে গাও ডা ভিজাই “।
চোখে মুখে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার ছাপ।কিভাবে যাবে আগামী দিন গুলি।আসছে বর্ষা মৌসুমে ঝর বৃষ্টিতে ঐ খুপরি টাতেই থাকতে হবে। আক্ষেপ করে বলেন – কতো জোয়ান মানুষ মরে আমার মরণডা যে কবে অইব, আল্লায় তো আমারে নেয়না”।পাশের এক দোকান দার এসে প্রতিবেদককে বললেন, মাঝে মাঝে লোকজন আসে। আইসা দেইখা চইলা যায় কিন্তু এই মহিলাকে কেউ কিছু কইরা দিল না। হুনছি সরকার গরীব মাইনসে গো ঘর দোয়ার কইরা দেয় , কই এই মহিলাডারে তো কেউ কিছু দিলনা।তিনি প্রতিবেদককে অনুরোধ করেন যাতে মনোয়ারা যেন একটু মাথা গুজার ঠাই হয়।
মনোয়ারা প্রতিবেদককে অনুরোধ করে বলেন, বাবা গো আমার আর আমার পুলার কতাডা পেপারে ছাইপা দেন যাতে কইরা চেয়ারম্যান মেম্বর রা আর শেখের বেটি দ্যাহে। তারা জানি আমারে ইট্টু জাগাজমিন ঘর দেয় তাই লে আমি পুলাডারে নিয়া এট্টু শান্তিতে ঘুমিয়া পারতাম”।
projonmo21.com Popular bangla online newsportal